রামাদানের পরেও কুরআনের সাথে অটুট থাকার জন্য করনীয়

 


(১) প্রতিটি মাসকে রামাদানের মতোই বিবেচনা করা

“আর আমরা আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট। ব্যাখ্যাস্বরূপ, মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ।”


রামাদানের বারাকাহ ভরা দিনগুলাে চলে যাবার সাথে সাথেই ইবাদাতের প্রতি আমাদের মানসিকতা বদলে ফেলা উচিত নয়। উপরােক্ত আয়াতটি প্রতিটি দিনের জন্যই সমানভাবে প্রযােজ্য। কুরআনের সাথে কাটানাের জন্য রামাদান বিশেষ একটা সময়। কিন্তু এর মানে এই না যে, রামাদানের বাইরে অন্যান্য মাসে আমরা কুরআনকে অবহেলা করতে শুরু করে দিব।


রামাদানের ব্যাপারে আপনার বছরে একবার চূড়ান্ত আমলের প্রদর্শনী করে ফেলার ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এই মাসকে দেখুন সমগ্র বছরের জন্য প্রশিক্ষণ হিসেবে, সারা বছর প্রতিদিন আপনি কী করতে পারেন তার একটি আভাস হিসেবে। সিয়ামরত থাকা অবস্থায় আপনি কী কী অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন আর এখন রামাদানের বাইরে এসে আপনি কী কী করতে পারবেন, সেগুলাে নিয়ে চিন্তা করে দেখুন।


কখনাে কখনাে দৈনন্দিন জীবনের ঝামেলার মধ্যে কুরআনকে সময় দেওয়াটা একটা অতিরিক্ত বােঝার মত মনে হতে পারে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

“আপনি কষ্ট-ক্লেশে পতিত হন- এ জন্য আমরা আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করিনি।”


কুরআনকে আপনার প্রয়ােজন হিসেবে দেখতে নিজের মানসিকতাকে সেভাবে ঠিক করে নিন। এই পরিবর্তন সন্দেহাতীতভাবে আপনাকে শান্তি আর তৃপ্তি এনে দেবে। সত্যটা হল, যেকোন দিনই আমাদের জন্য শেষ দিন হতে পারে আর এই দিনটিই শুধুমাত্র আমরা আখিরাতের জন্য বিনিয়ােগ করতে পারি। এই জীবনে পাওয়া বাকি সবকিছুর তুলনায় এই বিনিয়ােগটুকুই বহুগুণে দামী।


(২) লক্ষ্য নির্ধারণ করুন


নিজের জন্য একটা টার্গেট ঠিক করে নিন। আগামী এক বছরে কুরআনকেন্দ্রিক আপনার লক্ষ্য কী? আপনি কি পুরাে কুরআন খতম করতে চান নাকি নির্দিষ্ট কোন সূরার উপর মনােযােগ দিতে চান? আপনি সফলভাবে মুখস্থ করতে চান এমন কোনও অংশ আছে? যেটাই হােক না কেন, বাস্তবধর্মী আর নির্দিষ্ট পরিমাণে লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেটা অর্জন করতেও মনােযােগী থাকতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।


এটা এমন কোন কাজ না যেটায় অন্যের অনুসরণ করা লাগবে। আপনার ডায়রি, ফোন অথবা দেয়ালে কাগজ সেঁটে লিখে ফেলুন আপনার টার্গেট, যাতে সারাক্ষণ তা আপনার চোখের সামনেই থাকে। এতে করে আপনার মাথায় সবসময়ের জন্য গেঁথে যাবে আপনার লক্ষ্যটা কী ছিল। ধরাছোঁয়ার সীমানার মধ্যেই আপনার টার্গেটকে ঠিক করুন যাতে বাস্তব একটা অগ্রগতি দেখতে পান আপনি।


বিরাট কোন লক্ষ্য নিয়ে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে না। আপনার লক্ষ্যটা ছােট হােক, কিন্তু তােক সেটা ধারাবাহিক, নিরন্তর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তােমাদের মধ্যে কি কেউ রাতের বেলা কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতে পারবে? সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: কিভাবে এক রাতের মধ্যে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করা সম্ভব? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন:ওয়াল্লাহু আহাদ’ হল কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য।” 


কুরআন এতােটাই বারাকাহয় ভরপুর যে শুধুমাত্র সূরা আল ইখলাস পাঠ করলেই কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমতুল্য সওয়াব মিলে যায়। তাহলে কিসে আমাদেরকে বাধা দিচ্ছে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তাআলার কিতাবের সাথে সামান্য কয়েকটা মিনিট কাটাতে?


(৩) কুরআনের জন্য একটা সময় ঠিক করে নিন


আমরা আমাদের ইচ্ছেমত অনেক লক্ষ্যই ঠিক করতে পারি। কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া অথবা গন্তব্যে পৌঁছানাের পরিকল্পনা ছাড়া এই লক্ষ্যগুলাে পূরণ করা খুব কঠিন। আপনার কুরআন পড়া এবং এর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়, যেগুলাের উপর আপনি ফোকাস করছেন -সাপ্তাহিক ভিত্তিতে এগুলাের উপর কাজ করুন।


একটা সময় কি নির্দিষ্ট করতে পারবেন আপনি? হতে পারে সেটা আপনার যাতায়াতের সময় অথবা সকালে আপনার জেগে উঠার পর? অথবা ঘুমুতে যাবার আগে? সময় বের করতে পারলে তাে খুবই ভালাে। কিন্তু যদি সেটা না পারেন, তাহলেও অস্থির হবেন না। হাতে যতটুকু সময়ই থাকুক, সেটুকুই যথাসম্ভব ব্যবহার করুন।


কিছু দিন হয়তাে অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি ব্যস্ততায় কাটতে পারে। ফলে মনে মনে কুরআনের যে অংশটুকু পড়বেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন, সেটুকু আপনার পড়া হয়ে উঠলাে না। নিজের কাছেই এটার জন্য দায়বদ্ধ হয়ে থাকুন এবং পরের দিনের জন্য যা যা পরিকল্পনা করে রেখেছেন, সেগুলাের আগেই এই মিস হয়ে যাওয়া কাজটা করে ফেলছেন, সেটা নিশ্চিত করুন।


রামাদানে যে লক্ষ্যগুলাে আপনি হাসিল করতে চাইছেন সেগুলাের পথে স্থির থাকার জন্যে আপনার নিয়মিত একটা অভ্যাসের খুব দরকার। এটা নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত জরুরি একটা কাজ। আরাে ভালাে হয়, বন্ধুরা মিলে একটা রামাদান পরবর্তী কুরআন গ্রুপ বানিয়ে ফেলুন। এটা আপনাকে অনুপ্রাণিত থাকতে সাহায্য করবে এবং এমনকি যখন আপনার মনে হবে আপনার উৎসাহের জোয়ারে ভাটা পড়ছে ঠিক সেই সময়টাতেও এই উদ্যোগের ফলে আপনি নিজেকে কুরআনের সাথে যুক্ত রাখতে পারবেন।


মনে রাখবেন, কুরআনের সাথে যেটুকু সময়ই আপনি কাটান না কেন, সেটা আপনার জন্য সাহায্য হিসেবে এমনভাবে ফিরে আসবে যে আপনি সেটা কল্পনাও করতে পারবেন না।


“সাওম আর কুরআন কিয়ামতের দিন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে। সাওম বলবে: হে আল্লাহ, দিনের বেলা আমি তাকে খাবার আর তার আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত রেখেছি; তার জন্য আমাকে সুপারিশ করতে দিন। আর কুরআন বলবে: আমি তাকে রাতের বেলা জাগিয়ে রেখেছি; আমাকেও তার জন্য সুপারিশ করতে দিন। তাদের দুইজনকেই সুপারিশের অনুমতি দেওয়া হবে।”


(৪) শয়তানকে আপনার উপর বিজয়ী হতে দেবেন না


কেন আমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করতে পারি না এবং কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারি না সেজন্য আমরা অজুহাত দিয়ে দিয়ে দেরি করে ফেলি।


আপনার “সময়ের অভাব থাকতে পারে – কিন্তু তার মানে এই না যে ব্যস্ততার ভিড়ে যেটুকু সময় পাবেন তা অকাজে ব্যয় করবেন, নেট সার্ফিং করবেন। অলস কাজকারবার ঝেড়ে ফেলুন নয়তাে ঘুম থেকে ১৫ মিনিট আগে উঠুন।

আপনার হয়তাে এটা ভেবে খারাপ লাগছে যে যাইই পড়েন না কেন, তার কিছুই “আপনি বুঝতে পারেন না”, আপনি কুরআনের একজন শিক্ষককে খুঁজে বের করুন, তার কাছে কুরআনের অর্থ আর তাফসীর পড়তে শুরু করুন অথবা পারলে আরবি শিখুন।

আপনি হয়তাে ভাবছেন “সপ্তাহে ছুটির দিনে পড়তে বসবেন”—নিজেকে জীবনের বাস্তবতাটা বােঝার চেষ্টা করুন। আগামীকাল তাে নাও পেতে পারেন। অতএব যা করার সেটা আজই!

দুঃখজনকভাবে এটা হতে পারে “আমি জানি না কেন আমার এই অভ্যাসটা হয় না” – এরকম কোন একটা সমস্যা। যদি অভ্যাস করতে চান তাে সেজন্য কষ্ট করতে হবে। পাহাড়ে চড়া খুব একটা সহজ কাজ নয়, কিন্তু উঠতে যেয়ে যদি মাঝপথেই থেমে যান তাহলে আর কোনদিন পাহাড়ের চূড়ায় আপনার পৌঁছানাে হবে না। থেমে যাওয়ার চেয়ে আস্তে আস্তে এগােনােটাই উত্তম।

মনে রাখবেন, যখনই আপনি আল্লাহর দিকে একধাপ এগিয়ে যাবেন তখনই শয়তান আপনাকে বাধা দিতে আসবে।এখন রামাদানের পরে তাে সে মুক্ত। সে এখন চাইবে আপনার সাথে হাজারাে ধরনের মানসিক খেলা খেলতে, যাতে করে আপনাকে আরাে বেশি ভালাে একজন মুসলিম হতে বাধা দেওয়া যায়। কুরআনের সাথে সময় কাটাতে দেরি করিয়ে দেবার জন্য লাখখানেক অজুহাত নিয়ে সে আপনার কাছে আসবে। কিন্তু আপনি ধরা দেবেন না। বরং যখনই সে কোন অজুহাত নিয়ে আসবে তখনই উল্টো তাকেই ধরে ফেলুন।

Post a Comment

0 Comments