আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপের কারণে মানুষের অন্তর কঠোর হয়ে যায়।
ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, তা পাষাণ কিংবা তার চেয়ে বেশি কঠিন...। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৭৪)
অন্তর কঠিন হওয়ার আলামত :
(১) আল্লাহর আনুগত্য ও ভালকাজে অলসতা :
"তারা ছালাতে আসে অলসতার সাথে আর ব্যয় করে সংকুচিত মনে "(তওবা ৯/৫৪)
(২) আল্লাহর আয়াত ও উপদেশ শুনে অন্তর প্রভাবিত না হওয়া :
" যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় আল্লাহর আয়াত, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা করে "(আনফাল ৮/ ২)
(৩) দুনিয়াতে আল্লাহর আযাব-গযব ও মানুষের মৃত্যু দেখে অন্তর ভীত না হওয়া :
তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতিবছর তারা দু’একবার বিপর্যস্ত হচ্ছে, অথচ তারা এরপরও তওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না’ (তওবা ৯/১২৬)
(৪) দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পাওয়া ও আখেরাতকে ভুলে যাওয়া :
মুমিনদের আসল বাসস্থান হ’ল জান্নাত। দুনিয়া হ’ল আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। যদি কেউ আখেরাতের কথা ভুলে দুনিয়া অর্জনের পিছনে লেগে থাকে, তাহ’লে বুঝতে হবে তার অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।
(৫) আল্লাহকে সম্মান করা কমে যাওয়া : আল্লাহকে সম্মান না করার অর্থ হ’ল আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে মান্য না করা। সুতরাং কেউ আল্লাহর আদেশকে মান্য না করে নিষেধগুলিতে ডুবে থাকলে বুঝতে হবে লোকটির অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।
অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ :
(১) অন্তরকে দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত রেখে আখেরাতকে ভুলিয়ে রাখা :
প্রত্যেক বান্দারই দু’টি চোখ রয়েছে। এক চোখ দিয়ে সে দুনিয়ার বিষয় দেখে। আর অন্তরে যে চোখ আছে তা দিয়ে সে আখেরাতের বিষয় দেখে। আল্লাহ যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান, তাহ’লে তার অন্তরে যে চোখ আছে তা খুলে দেন। ফলে আল্লাহ অদৃশ্যের যে ওয়াদা করেছেন সে সেগুলি দেখতে থাকে। আর আল্লাহ যদি অন্য কিছু ইচ্ছা করেন, তাহ’লে তার অবস্থায় তাকে ছেড়ে দেন। তারপর এ আয়াতটি পাঠ করেন, ‘তাদের অন্তর কি তালাবদ্ধ করা হয়েছে’ (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)
(২) অলসতা :
আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় রয়েছে, কিন্তু তারা তদ্বারা উপলব্ধি করে না। তাদের চক্ষু রয়েছে কিন্তু তারা তদ্বারা দেখে না। তাদের কর্ণ রয়েছে, কিন্তু তদ্বারা তারা শোনে না। তারাই হ’ল পশুর ন্যায় বরং তা অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত। তারাই হ’লো গাফিল বা অমনোযোগী’ (আ‘রাফ ৭/১৭৯)
(৩) খারাপ বন্ধুদেরকে ভালবাসা ও তাদের সাথে উঠা-বসা করা :
সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতার থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না। হয় তুমি আতর খরিদ করবে, না হয় তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কর্মকারের হাপর হয় তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে।
(৪) অধিক হারে গুনাহ ও খারাপ কাজ করা :
যখন বান্দা কোন পাপ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। যখন সে তওবা করে, তখন সেটা তুলে নেওয়া হয়। আর ইস্তেগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিষ্কার করা হয়। আর যদি পাপ বাড়তেই থাকে, তাহ’লে দাগও বাড়তে থাকে। আর এটাই হ’ল মরিচা। যেমন আল্লাহ বলেন, না এটা সত্য নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনের উপর মরিচারূপে জমে গেছে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১৪)আহমাদ, তিরমিযী
(৫) মৃত্যুর কষ্ট ও আখেরাতের আযাব ভুলে যাওয়া : মৃত্যু ও আখেরাতের চিন্তা মানুষের অন্তরকে নরম রাখে। কেউ মৃত্যুর কথা ও আখেরাতে জবাবদিহিতার কথা ভুলে গেলে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়।
নিম্নে অন্তরের কঠোরতা দূর করার উপায় বর্ণনা করা হলো—
১. আল্লাহকে চেনা : অন্তরের কঠোরতা দূর করার প্রধান উপায় হলো আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, শাস্তি ও মর্যাদা জানার মাধ্যমে অন্তর নরম করার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, '(আল্লাহ) পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাঁর দিকেই হবে প্রত্যাবর্তন। ’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৩)
২. কোরআন তিলাওয়াত করা : কোরআন তিলাওয়াত করা ও এর অর্থ বুঝে আমল করার মাধ্যমে অন্তর নরম হয়। আল্লাহ বলেন, ‘(বিনয়ী হলো তারা) যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে বিনীত হয় এবং যারা বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে।
(সুরা : হজ, আয়াত : ৩৫)
৩. অন্তরকে পরকালীন চেতনায় উজ্জীবিত করা : অন্তরকে বোঝাতে হবে যে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এ জীবনের পরে আছে স্থায়ী ও অনন্ত জীবন। সে জীবনের তুলনায় এ নশ্বর জীবন নিতান্তই তুচ্ছ ও নগণ্য।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উপমা যেমন তোমাদের কেউ মহাসাগরের মধ্যে নিজের একটি আঙুল ডুবিয়ে দেয়, এরপর সে লক্ষ করে দেখুক তা কী (পরিমাণ পানি) নিয়ে এলো। (মুসলিম, হাদিস : ২৮৫৮)
৪. মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থার কথা চিন্তা করা : দুনিয়ার জীবনের পর সবাইকে মরতে হবে এবং দুনিয়ার জীবনের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এ চিন্তা ও বিশ্বাসই মানুষের অন্তর নরম করতে পারে। মরণের পর কবরে যেতে হবে, মুনকার-নাকিরের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, হাশরের ময়দানে আমলনামা নিয়ে উঠতে হবে, আমল ভালো হলে জান্নাত, না হয় জাহান্নাম। এ কথা চিন্তা ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই অন্তর নরম হয়।
৫. আল্লাহর নিদর্শনাবলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা :
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ উত্তমবাণী তথা কিতাব নাজিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনঃপুনঃ পঠিত। এতে তাদের পশম কাঁটা দিয়ে ওঠে চামড়ার ওপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথনির্দেশের মাধ্যম। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন তার কোনো পথ প্রদর্শক নেই। (সুরা : জুমার, আয়াত : ২৩)
৬. সৎ লোকদের সঙ্গী হওয়া :
আল্লাহ বলেন, ‘আপনি নিজেকে তাদের সৎসঙ্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, সে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। (সুরা কাহফ, আয়াত : ২৮)
৭. দোয়া করা : দোয়া প্রত্যেক মুমিনের প্রধান হাতিয়ার এবং অন্তরের কঠিনতা থেকে পরিত্রাণকারী। অন্তরের চিকিৎসার জন্য নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়া যায়, যা রাসুল (সা.) পাঠ করতেন—
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা মুছার্রিফাল কুলুব, ছাররিফ কুলুবানা আলা তাআতিক।
অর্থ : হে হৃদয় পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলো আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৪)
৮. বেশী বেশী আল্লাহর যিকর করা ও গুনাহ মাফ চাওয়া :
হে আবু সাঈদ! আপনার নিকট অন্তর কঠিন হওয়ার অভিযোগ করছি, তিনি বললেন, তুমি (অন্তরের কঠিনতা থেকে বাঁচতে) যিকর করবে।
৯. আত্মসমালোচনা করা :
মানুষ যদি নিজে নিজের দিকে না তাকায়, তাহ’লে সে তার অন্তরের রোগের অবস্থা জানতে পারে না। তাই মানুষের উচিত তার প্রতিদিনের কার্যকলাপের দিকে নিজেই লক্ষ্য রাখা এবং ভাল কাজ অব্যাহত রাখা ও মন্দা কাজ ত্যাগ করা।
১০. ইসলামের জ্ঞানে গুণান্বিত আলেম ও সৎ লোকদের সংশ্রবে সময় কাটানো:
তাদের সান্নিধ্য লাভ করা এবং তাদের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করা। আল্লাহ বলেন, আপনি নিজেকে তাদের সৎসঙ্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। (সূরা কাহফ: ২৮)
Tag- #আমার ইসলাম
#ইসলামিক বাণী
#ইসলামিক বানী
#ইসলামিক জীবন
#ইসলামিক বানি
#porda niye status
#islamic jibon
#সূরা আল আসর

0 Comments