আল্লাহ রাববুল আলামীন মানুষকে তিনটি বিশেষ উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সেগুলো হল জ্ঞান, দেহ এবং আত্মা। জ্ঞানকে দিকনির্দেশনা দেয় ঈমান, দেহের কল্যাণ সাধন করে ইসলাম এবং আত্মার পরিশুদ্ধি নিশ্চিত করে ইহসান।
আত্মশুদ্ধি বলতে বোঝায় অন্তরকে পবিত্র করা। অর্থাৎ অন্তর থেকে সব ধরনের মন্দ স্বভাব দূর করে ভালো ও উত্তম গুণসমূহ দ্বারা অন্তরকে সজ্জিত করা। অন্তরের মন্দ স্বভাব হচ্ছে কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, অহঙ্কার, রিয়া-লোক দেখানো প্রবণতা, কৃপণতা, কুধারণা প্রভৃতি। অন্তরের উত্তম গুণ হচ্ছে ইখলাছ, সবুর, শোকর, আত্মসংযম, আল্লাহভীতি, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল, আল্লাহর ভালোবাসা, বদান্যতা, নম্রতা, ভদ্রতা, সততা ইত্যাদি। মোটকথা, আত্মশুদ্ধির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত আত্মার ময়লা পরিষ্কার করা। অর্থাৎ আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় মন্দ অভ্যাসগুলো সংশোধন করা। দ্বিতীয়ত পছন্দনীয় গুণাবলি অর্জনের দ্বারা আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে আত্মার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।
অন্তর হচ্ছে পছন্দ ও ইচ্ছাশক্তির উৎস, পরীক্ষা করার ভিত্তি, আমল কবুল হওয়ার মাধ্যম, প্রতিদান ও শাস্তি বৃদ্ধির কারণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বান্দার প্রত্যেক কর্মের গ্রহণযোগ্যতা তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাণ্ডই পাবে, যা সে নিয়ত করে।’ (বোখারি : ১)
আল্লাহ বলেছেন, ‘সে-ই সফল যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আশ-শামস, আয়াত : ৮-৯)
সাবধান! নিশ্চয়ই মানবদেহে একখণ্ড গোশতের টুকরো আছে, যখন তা সুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরটাই সুস্থ হয়ে যায় এবং যখন তা অসুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো! এটাই হচ্ছে কলব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪১৭৮)
১. অন্তর পরিবর্তনশীল
আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘আদম সন্তানের অন্তর পাতিলে থাকা ফুটন্ত ও টগবগ করা পানি থেকেও অধিক পরিবর্তন হয়, যখন তাতে উত্তাপ দেওয়া হয়। মানুষের নাম ইনসান রাখা হয়েছে। কারণ, মানুষ ভুলে যায়। অন্তরকে কলব বলা হয়। কারণ, তা দ্রুত পরিবর্তন হয়।’ (মুসনাদে আহমদ : ২৩৯)।
২. আল্লাহ অন্তরের পরীক্ষা নেন
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ পার্থিব জীবনে এবং পরকালে মোমিনদের মজবুত বাক্য দ্বারা দৃঢ় করেন। তিনি জালেমদের পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা করতে পারেন।’ (সুরা ইবরাহিম : ২৭)
৩. অন্তর পরিবর্তন হয় আল্লাহর ইচ্ছায়
হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লংঘনে প্রবৃত্ত কোরো না। আমাদের ওপর তোমার অনুগ্রহ দান করো। তুমিই সবকিছুর দাতা।’ (সুরা আলে ইমরান : ৮)
৪. অন্তরের পবিত্রতা জরুরি
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ?তায়ালা মানুষের শরীর অথবা ধন-সম্পদ দেখেন না। বরং তিনি আমাদের অন্তর এবং আমল দেখেন।’ (মুসলিম : ৬৭০৭)
আত্মা পরিশুদ্ধ করার বিভিন্ন উপায়
১. অন্তরের পবিত্রতার জন্য দোয়া করা : অন্তরের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির জন্য এবং আল্লাহর বিধান পালনে তার দৃঢ়তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার আনুগত্যে দৃঢ় করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯৪২০)
২. অন্তরের ব্যাধির ব্যাপারে উদাসীন না হওয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের অন্তর আল্লাহর দুই আঙুলের মধ্যে অবস্থিত, তিনি তা যেমন ইচ্ছা পরিবর্তন করেন।
’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৯২১)
৩. পরকালকে ভয় করা : আত্মার পরিশুদ্ধি ছাড়া কিয়ামতের দিন কোনো কিছুই উপকারে আসবে না। সুতরাং পরকালের ভয় অন্তরে উপস্থিত রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আজ সম্পদ ও সন্তান কোনো উপকার করতে পারবে না, কেবল যে পরিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।’ (সুরা শুআরা, আয়াত : ৮৮-৮৯)
৪. অন্তরের সুস্থতার জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব : রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মশুদ্ধির জন্য নিয়মিত দোয়া করতেন। তাই আলেমরা আত্মশুদ্ধির জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব বলে মত দিয়েছেন। মহানবী (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সুস্থ অন্তর (কলব) কামনা করছি।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৭১১৪)
৫. কোরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আত্মশুদ্ধির পদ্ধতি অবলম্বন করা : আত্মশুদ্ধির বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! রাসুল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করেন যা তোমাদের প্রাণবন্ত করে, তখন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে সাড়া দেবে। জেনে রেখো! আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে থাকেন।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ২৪)
৬. আল্লাহর স্মরণ অন্তর নরম করে : আল্লাহর জিকিরে মানব হৃদয় প্রশান্ত ও নরম হয়। এতে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘জেনে রেখো! আল্লাহর জিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাআদ, আয়াত : ২৮)
৭. অসহায় মানুষের পাশে থাকা : হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে তার অন্তরের কঠোরতা সম্পর্কে অভিযোগ করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘যখন তুমি তোমার অন্তরকে নরম করার ইচ্ছা করবে তখন এতিমের মাথায় হাত বোলাবে এবং মিসকিনকে খানা খাওয়াবে।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ৯০১৮)
৮. কবর জিয়ারত ও মৃত্যুর স্মরণ : কবর জিয়ারত ও মৃত্যুর স্মরণের মাধ্যমে মানুষের অন্তর আল্লাহমুখী হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইতোপূর্বে আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা জিয়ারত করো। কেননা নিশ্চয়ই তা আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অন্তরের উন্নতি ঘটায়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৩০০৫)
৯. অন্তরের কঠোরতা পরিহার : কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা একাধিক স্থানে কঠোর হৃদয়ের নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘... দুর্ভোগ সে কঠোর হৃদয় ব্যক্তিদের জন্য যারা আল্লাহর জিকির হতে পরাঙ্মুখ। তারা স্পষ্টত বিভ্রান্তিতে রয়েছে।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ২২)
১০. কলুষিত আত্মার পরিণতি স্মরণ রাখা : রাসুলুল্লাহ (সা.) কলুষিত আত্মার পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘সাবধান! নিশ্চয়ই মানবদেহে একখণ্ড গোশতের টুকরো আছে, যখন তা সুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরটাই সুস্থ হয়ে যায় এবং যখন তা অসুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো! এটাই হচ্ছে কলব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪১৭৮)
যেসব আমলে অন্তর পরিশুদ্ধ হয়
১. আল্লাহর ভালোবাসা :
আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন, তারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৫)
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা :
ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তির ভেতর তিনটি গুণ থাকবে সে ঈমানের মিষ্ট লাভ করবে : ক. তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা অন্য সব কিছু থেকে বেশি হবে, খ. কোনো মানুষের সঙ্গে তার ভালোবাসা হলে সেটাও আল্লাহর জন্যই হবে, গ. ঈমান গ্রহণের পর কুফরের দিকে ফিরে যাওয়া তার জন্য এমন অপছন্দের ও কষ্টকর হবে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপছন্দের। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৯৪১)
৩. মানবীয় সম্পর্কও আল্লাহর জন্য রাখা :
হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো মানুষের সঙ্গে তার ভালোবাসা হলে সেটাও আল্লাহর জন্যই হবে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৯৪১)
৪. আল্লাহর জন্য অন্তর বিগলিত করা :
ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুমিন তারাই, যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর কম্পিত হয়, আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ঈমানের জ্যোতি বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা রাখে। ’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ২)
৫. আল্লাহকে ভয় করা :
ইরশাদ হয়েছে, ‘এতে (কোরআন) যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়, অতঃপর তাদের দেহমন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। ’ (সুরা ঝুমার, আয়াত : ২৩)
৬. বেশি বেশি জিকির করা :
ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহর জিকির করে। ’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯১)
৭. আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকা :
ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করুন এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হোন। ’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৮)। সর্বোপরি মুমিন আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার ভালোবাসা চাই, এমন আমল চাই, যা আমাকে আপনার কাছে পৌঁছে দেবে। হে আল্লাহ, আপনার ভালোবাসাকে আমার কাছে আমার নিজের থেকে, আমার পরিবার থেকে এবং সুমিষ্ট ঠাণ্ডা পানি থেকে প্রিয় করে দিন। ’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৯০)
tag- #ইসলামিক বাণী#আমার ইসলাম#ইসলামিক বাণী#ইসলামিক বানী#ইসলামিক জীবন#ইসলামিক বানি
#আমার ইসলাম
#ইসলামিক বাণী
#ইসলামিক বানী
#ইসলামিক জীবন
#ইসলামিক বানি
#porda niye status
#islamic jibon
#সূরা আল আসর

0 Comments